দেশে বসে কিভাবে বিদেশি কোম্পানিতে রিমোট ওয়ার্ক করবেন

রিমোট ওয়ার্ক

আবর্তমান সময়ে, কাজের ধরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাপী এখন অনেক মানুষই রিমোটলি কাজ করছে, অর্থাৎ অফিসে না গিয়ে বাড়ি বা অন্য কোনো জায়গা থেকে কাজ করছে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এখন অনেক বাংলাদেশীরা বাংলাদেশে বসে বিভিন্ন বিদেশি কোম্পানির জন্য রিমোট ওয়ার্ক করছে। আর এই পরিবর্তন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে। এখন তারা বাংলাদেশে বসেই বিশ্বের যে কোনো বিশ্বের যে কোন কোম্পানিতে ভালো বেতনে জব করতে পারবে।

রিমোট জবের বিশ্বব্যাপী উত্থান 

রিমোট জব, যার অর্থ হল গতানুগতিক অফিসের বাইরে যে কোনো জায়গা থেকে কাজ করা, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের প্রায় ৪২% এখনরিমোটলি কাজ করছে। একইভাবে, ইউরোপ জুড়ে প্রায় ৩৭% কর্মী নিয়মিত রিমোট জব করে।

বাংলাদেশেও এই প্রবণতা বাড়ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশে রিমোটলি কাজ করে এমন লোকের সংখ্যা ৩০% এরও বেশি বেড়েছে। এই বৃদ্ধি মূলত কাজের প্রসেসকে ডিজিটালি ট্রান্সফার করা এবং বিশ্বব্যাপী রিমোট জবের সুযোগের বৃদ্ধির কারণে। পাশাপাশি প্রযুক্তির উন্নয়ন, বিশেষ করে ইন্টারনেট এবং ক্লাউড কম্পিউটিং – এর যুগান্তকারী ডেভেলপমেন্ট রিমোটলি কাজ করাকে আরও সহজ করে তুলেছে। এছাড়াও  যেসকল কর্মীরা আরও বেশি নমনীয় কাজের ব্যবস্থা খুঁজছেন, রিমোট জব তাদের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠেছে। এটি সহজেই অনুমেয় যে রিমোট জবের এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে। প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন এবং কর্মীদের কাছে আরও বেশি নমনীয় কাজের চাহিদার কারণে, রিমোট জবের হার ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

রিমোট জবের সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা

বিশ্বব্যাপী রিমোট জবের উত্থান বাংলাদেশীদের জন্য একটি গেম-চেঞ্জার। এটি বাংলাদেশী কর্মীদের দেশে বসেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কোম্পানিতে কাজ করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭০% কোম্পানি এখন রিমোট টিম ব্যবহার করে, বাংলাদেশের দক্ষ ব্যক্তিদের জন্য এই আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করার জন্য একটি দুর্দান্ত সুযোগ।

রিমোট জবের সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে এর জন্য আপনাকে ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকতে হবে না। আপনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ বা অন্য যেকোন দেশের কোম্পানিগুলোতে আপনার দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে কাজ করতে পারেন, একইসাথে বাংলাদেশে বসবাস করার সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এটি বাংলাদেশিদের আরও ভালো চাকরির সুযোগ, উচ্চতর বেতন স্কেল এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন টিমের সাথে কাজ করার সুযোগ প্রদান করে।

রিমোট জবের সম্প্রসারণের ফলে বাংলাদেশের দক্ষ ব্যক্তিরা এখন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কোম্পানির সাথে কাজ করে তাদের দক্ষতা প্রমাণ করতে পারে। এটি তাদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করার এবং তাদের স্কিলগুলোকে আরও ডেভেলপ করার সুযোগ দেয়। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। দূরিমোট জবের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী কোম্পানির সাথে কাজ করা বাংলাদেশীদের জন্য আয়ের নতুন উৎস তৈরি করবে। এছাড়াও, রিমোট জবের মাধ্যমে দেশের বাইরে থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

দেশে বসে কিভাবে বিদেশি কোম্পানিতে রিমোট ওয়ার্ক করবেন

বাংলাদেশে থেকে বিদেশী কোম্পানিতে রিমোট জব করতে হলে আপনাকে একটি স্ট্রাটেজিক রোডম্যাপ অনুসরণ করতে হবে। এই প্রসেসে বিভিন্ন গ্লোবাল জব প্ল্যাটফর্মগুলি এক্সপ্লোর করা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন থেকে শুরু করে অ্যাপ্লিকেশন টেলারিং এবং ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ, প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে, দেশে বসে কিভাবে বিদেশি কোম্পানিতে রিমোট ওয়ার্ক করবেন সে বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারণা তুলে ধরা হল:

রিসার্চ এর মাধ্যমে চাকরির সুযোগ খুঁজে বের করা

  • গ্লোবাল জব প্ল্যাটফর্মগুলি এক্সপ্লোর করুন: আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, লিঙ্কডইন এবং স্কিল জবস সহ অন্যান্য গ্লোবাল জব প্ল্যাটফর্মগুলি নিয়মিত ব্রাউজ করুন। এই সমস্ত সাইটগুলোতে  অধিকাংশ গ্লোবাল কোম্পানি তাদের রিমোট জবের ভেকেন্সি পোস্ট করে থাকে। এই প্ল্যাটফর্মগুলি সম্মিলিতভাবে দূরিমোট জব লিস্টিংয়ের ৬০% এরও বেশি হোস্ট করে থাকে।
  • জব রিকোয়ারমেন্ট গুলো ভালোভাবে বুঝুন: প্রথমে, আপনার স্কিল গুলো ইভালুয়েট করুন এবং রিমোট জবের চাহিদার সাথে সেগুলো এলাইন করুন। রিমোট জবে সাধারণত জুম এবং স্ল্যাকের মতো বিভিন্ন ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করা হয় এবং সেখানে কমিউনিকেশন এবং টাইম ম্যানেজমেন্টের মতো স্কিলস গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায় যে এই সমস্ত স্কিল গুলো রিমোট জবের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

আপনার দক্ষতা এবং রিজিউমি আপডেট করা 

  • চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন: ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রোগ্রামিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট রাইটিং, ডাটা এনালাইসিস, SEO, IOS/Android Development, ডিজিটাল সেলস, ডাটা সাইন্স – এর  মতো চাহিদাপূর্ণ দক্ষতা অর্জন আপনাকে প্রতিযোগিতামূলক রিমোট জবের বাজারে এগিয়ে রাখবে। সুতরাং আপনি যদি এই রেসে নিজেকে এগিয়ে রাখতে ক্যান তাহলে রিমোট ওয়ার্কের জন্য দরকারি স্কিলসগুলো নিজের মধ্যে ডেভেলপ করুন।  
  • রিমোট ওয়ার্ক ফ্রেন্ডলি রিজুমি তৈরি করুন: রিমোট জবের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত এবং কার্যকর রিজিউম তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমপ্লয়ারগণ প্রতিটি রিজিউমের উপর প্রায় ১০ থেকে ২০ সেকেন্ড সময় ব্যয় করে, তাই এআপনার রেজিউমিতে যদি রিমোট জবের জন্য প্রয়োজনীয় স্কিলগুলোকে সুন্দর ভাবে হাইলাইট করেন তাহলে আপনার শর্টলিস্টেড হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
    আরও পড়ুন: প্রফেশনাল সিভি রাইটিং এর বিস্তারিত গাইডলাইন
  • প্রতিটি জবের রিকোয়ারমেন্ট অনুযায়ী রিজুমি কাস্টমাইজ করুন: প্রতিবার আবেদনের সময় আপনার রিজুমিটি এমন ভাবে আপডেট করুন যেন জব রিকয়ার্মেন্টস এর সাথে আপনার স্কিল এবং এক্সপার্টিস গুলো ভালোভাবে ম্যাচ করে। যদি আপনার সিভিটি উল্লেখিত রিকোয়ারমেন্টসের সাথে ম্যাচ করে, তাহলে আপনার শর্টলিস্টেড হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে। 

ভার্চুয়াল ইন্টারভিউ প্রিপারেশন

  • অনলাইন ইন্টারভিউ-এর জন্য প্রস্তুতি নিন: রিমোট জবের ইন্টারভিউগুলি বেশিরভাগই অনলাইনে হয়ে থাকে, সুতরাং অনলাইনে ইন্টারভিউ দেওয়ার প্রেক্টিস করুন এবং বিভিন্ন ভিডিও কনফারেন্সিং টুলসের ব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে জানুন। একটি রিপোর্ট অনুযায়ী প্রায় ৮৬% চাকরিপ্রার্থী ভার্চুয়াল ইন্টারভিউকে চ্যালেঞ্জিং মনে করেন যার অন্যতম কারণ হচ্ছে ভার্চুয়াল কমিউনিকেশন স্কিলস এবং অনলাইন ইন্টারভিউ টুলস ব্যবহারে এক্সপার্টিসের অভাব।
  • কালচারাল ডাইভারসিটি এবং টিমওয়ার্কের উপর জোর দিন: রিমোট জবের ক্ষেত্রে বিভিন্ন টিমের সাথে কাজ করার দক্ষতা, এডাপ্টেবিলিটি, কমিনউনিকেশন, কাল্চারাল ডাইভারসিটি ইত্যাদি স্কিলস অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইন্টারভিউতে এইসকল স্কিলসের উপর জোর দিন।  
  • ইফেক্টিভ টাইম ম্যানেজমেন্ট কৌশল অবলম্বন করুন: রিমোট জব সাধারণত ভিন্ন ভিন্ন টাইম জোনে হয়ে থাকে। সুতরাং ইফেক্টিভ টাইম ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাটেজি রিমোট জবের ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গুগল ক্যালেন্ডার বা অন্যান্য টুলস ব্যবহার করে আপনি আপনার টাইম কে সঠিক ভাবে ম্যানেজ করতে পারেন। অন্যথায় মিসম্যান জেড টাইম জোনের ফলে ডেডলাইন মিস করার চান্স থাকতে পারে।

রিমোট ওয়ার্কস্পেস সেটআপ করা

  • নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা: রিমোট জবে সফল ভাবে কাজ করতে হলে একটি স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমপ্লয়ারের মতে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ রিমোট জবের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
  • একটি Ergonomic ওয়ার্কস্পেস তৈরি করা: প্রোডাক্টিভিটি এবং ফোকাস বাড়ানোর জন্য একটি ergonomic এবং আরামদায়ক ওয়ার্কস্পেস ডিজাইন করুন। গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে একটি ভালোভাবে ডিজাইন করা কর্মক্ষেত্র শারীরিক চাপ কমিয়ে দেয় এবং সামগ্রিক কাজের পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে ইম্প্রুভ করে।

রিমোট জবের সফলতার জন্য মনে রাখার কিছু জিনিস:

  • আপনার একটি শান্ত এবং বিভ্রান্তিহীন কাজের জায়গা থাকতে হবে।
  • আপনার কাজের সময়সূচী মেনে চলুন এবং আপনার কাজটি সম্পূর্ণ করুন।
  • আপনার ম্যানেজারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করুন।
  • আপনার কাজের প্রতি উদ্যোগী এবং অনুপ্রেরিত থাকুন।

One thought on “দেশে বসে কিভাবে বিদেশি কোম্পানিতে রিমোট ওয়ার্ক করবেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *